অ্যান্টেনার বিভ্রাট

‘পাইছে পাইছে! আবার গেছেগা… পাইছে… আগেরবার যেমনে ধরছিলি আবার ধর… ঝিরঝির করে… ধুর একটু ঘুরা না’
এখনো কানে বাজে তাই না বলেন? তাইতো হওয়ার কথা। সেই পুরোনো চেনা শব্দ। দুই তিন বাড়ি পরপর, কোথাও আবার পুরো মহল্লায় একটাই সাদা কালো টিভি।
হ্যাঁ! সেই পুরোনো সাদা কালো টিভি আর তার অ্যান্টেনা! কি মধুর সম্পর্ক সাদা কালো টিভি,অ্যান্টেনা আর আমরা যারা ৮০-৯০ দশক বা তার আরেকটু পর অব্দি সময়ে বড় হয়ে উঠেছি।

একদিন যদি খেলা থাকতো বা কার্টুন বা সিন্দবাদ,আলিফ লায়লা আরো কত কি! তাহলেই শুরু হয়ে যেত অ্যান্টেনা নিয়ে যতো জল্পনা কল্পনা। প্রতি মহল্লায় একজন অ্যান্টেনা মাস্টারও ছিলো! যে খুব সুন্দর টিউনিং করতে পারতো। মহল্লায় যেই বাড়ির টিনের চালের সাথে অ্যান্টেনা আছে সেটা দেখে বোধ হয় তখন যারা বিমানে চড়তেন তারাও উপভোগ করতেন আর উপর থেকে বলতেন আরে এই বাসায় টিভি আছে।
শুক্রবার বিকেলে মহল্লায় একটা আলাদাই ব্যাপার থাকতো। মুরুব্বিরা চা দোকান, ফার্মেসি এসব জায়গায় বসে আড্ডা দিতেন। মা-খালারা এলাকার প্রতিবেশিদের সাথে গল্প করতেন আর আমরা যারা ছোটোরা তারা খেলতাম মাঠে। বেশিরভাগ সময় দেয়াল দেয়া মাঠই হতো, বল গিয়ে পড়তো বাইরে বা কারো বাড়িতে। কিন্তু যখনই মাগরিবের আযান দিলো মানে মুহূর্তেই পুরো এলাকা খালি। সবাই গিয়ে টিভির সামনে। আর তখনই শুরু হতো ডাকাডাকি অ্যান্টেনা নিয়ে। বেশিরভাগ সময়ই বাড়ির বড় ছেলে বা চাচা গোত্রীয় কারো থাকতো এই দায়িত্ব। আপু, মা, খালারা বসে থাকতেন টিভি’র সামনে।

আস্তে আস্তে রাত হতো। খাওয়া দাওয়া শুরু হতো। সবাই ঘুমিয়ে পড়তো অল্পতেই। তখন রিলস দেখা লাগতো না। বড়জোর দাদী, নানী, খালা, ফুপুদের গল্প শোনা লাগতো, বৃষ্টির শব্দ ছিলো বোনাস। আপন আপন ঘ্রাণে কি সুন্দর ঘুম হতো এক টানা ভোর অব্দি।
বৃষ্টি হলে অবশ্য একটা বিপত্তি ছিলো। অ্যান্টেনা চেক করতে হতো পরদিন। আর যদি টিভি দেখার সময় বৃষ্টি হতো তাহলে তো কথাই নেই পুরো বাড়ির মুড অফ।

টাইম ট্রাভেল করতে আসলে টাইম মেশিন লাগে না! হুটহাট চোখ বন্ধ করে নিজের মহল্লার আগের রূপটা ভাবলেই এসব মনে পড়ে যায়। কালে কালে চুণের দেয়াল রঙিন হয়েছে, অ্যান্টেনা আর নেই। আওয়াজ শুনে বোঝা যায় কার বাসায় টিভি আছে। এখন তো একইসাথে টিভি আর ইউটিউবের সাউন্ড আসে। এক পাশে টিভি চলে আরেকপাশে বাচ্চাকে ভিডিও দেখিয়ে মা খাওয়ায়। আচ্ছা ওরা কী নস্টালজিক হবে কখনও? পরিবর্তন সত্যি হলে বোধ হয় কালে কালে আরো সব বদলে যাবে তখন ওরাও যা আছে তাই নিয়ে নস্টালজিক হবে…

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Posts